সকালটা ছিল একেবারেই অন্যরকম। সাজেক ভ্যালীর পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল
আমি যেন মেঘের মাঝেই আছি। চারদিকে সাদা মেঘের ঢেউ, হালকা ঠান্ডা বাতাস আর দূরের
পাহাড়গুলো যেন ছবির মতো সাজানো। Sajek Valley এমন এক জায়গা, যেখানে একবার গেলে
মন ভরে যায়, কিন্তু তবুও মনে হয় কিছু একটা বাকি রয়ে গেছে। আমার ক্ষেত্রেও
ঠিক তাই হয়েছিল।
দুই রাত সাজেকে কাটানোর পর মনে হলো, এতদূর যখন এসেছি, তাহলে পাশের আরেকটি
অসাধারণ জায়গা রাঙ্গামাটি (Rangamati) রুপটাও একটু পরখ করে আসি। আমার মত
অনেকেই হয়ত এমন প্ল্যান করেন কিন্তু সঠিক রুট প্ল্যানের অভাবে রাঙ্গামাটি ট্রিপ
ক্যন্সেল করেন।
আপনাদের সুবিধার কথা চিন্তা করেই আমাদের এই ট্রাভেল ব্লগ।
আজকের এই ব্লগ তেকে জানতে পারবেন, সাজেক থেকে কি ভাবে রাঙ্গামাটি যাবেন
, গাড়ি ভাড়া , রিসোর্ট, খাবার সহ রাঙ্গামাটি ভ্রমনের যাবতীয় তথ্য।
Sajek to Rangamati travel guide with Kaptai Lake boat view and hills Bangladesh
তাই সাজেকে অন্তত দুই রাত থাকা সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত। তবে সময় কম থাকলে
একদিনেও ঘোরা সম্ভব, যদিও একটু ক্লান্তি থাকবেই।
সাজেকে এক বা দুই রাত কাটানোর পর, সকালে ঠিক ১০টার আর্মির স্কট-এ আপনি সাজেক
থেকে বের হবেন। পাহাড়ি রাস্তা পেরিয়ে পৌঁছে যাবেন খাগড়াছড়িতে। সেখানে পৌঁছে
আগে একটু ফ্রেশ হয়ে দুপুরের খাবার সেরে নিন।
এরপর শুরু হবে খাগড়াছড়ি শহরের আশেপাশে দারুণ দারুণ জায়গার এক্সপ্লোরেশন। সময়
কম হলেও ঘুরতে মিস করবেন না-
রিসাং ঝর্ণা
আলুটিলা গুহা
তারেং
জেলা পরিষদ পার্ক
খাগড়াছড়ি শহরের আশেপাশে স্পটে বেশি সময় নষ্ট করবেন না।
এই স্পটগুলো দ্রুত ঘুরে শেষ করে বিকেলের মধ্যে চলে আসুন খাগড়াছড়ি শহরের লোকাল
বাস টার্মিনালে। এটি শহরের সিটি গেইটের একটু আগে, শান্তিনগর নামক এলাকায়
অবস্থিত। আশেপাশের মানুষকে রাঙ্গামাটি যাওয়ার বাসস্ট্যান্ড
কোথায়?
জিজ্ঞাসা করলেই দেখিয়ে দিবে। এখান থেকেই পাবেন রাঙ্গামাটির বাস।
সাজেক থেকে রাঙ্গামাটি যাওয়ার ভাড়া
খাগড়াছড়ি থেকে রাঙ্গামাটি যেতে সময় লাগে প্রায় ২ থেকে ২.৩০ ঘন্টা, আর
ভাড়া পড়বে জন প্রতি ১৭০-২০০ টাকা।
তবে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাথায় রাখবেন,
এই রুটের শেষ বাস ছাড়ে বিকেল ৪টায়। তাই যেভাবেই হোক, এই সময়ের আগেই
টার্মিনালে পৌঁছানোর চেষ্টা করবেন। না হলে সেদিন আর রাঙ্গামাটি যাওয়া
সম্ভব হবে না।
আরেকটা কথা, এই রুটের বাসগুলো বেশ সাধারণ মানের। তাই আপনি যদি একটু
আরামদায়ক ভ্রমণ চান, তাহলে খাগড়াছড়ি থেকে রেন্ট-এ-কার নেওয়াই ভালো
অপশন।
গাড়ির ধরন অনুযায়ী ভাড়া সাধারণত ৬,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে
পারে।
তবে মাহিন্দ্রা সিএনজি রিজার্ভ নিয়ে যেতে পারবেন। ৫ জনের জন্য ভাড়া
পড়বে ৩০০০ টাকা। (শুধু নামিয় দিয়ে আসবে) বড় টিম হলে পিকআপ রিজার্ভ
সাশ্রয়ী হয় নিরাপদ বেশি। ১২ জন যাওয়া যায় । ভাড়া পড়বে ৭০০০ টাকা। (শুধু
নামিয় দিয়ে আসবে)
রাঙ্গামাটিতে পৌঁছানোর আগে যদি আপনার হোটেল বুকিং করা থাকে, তাহলে বাস
থেকে সরাসরি সেই লোকেশনেই নেমে যেতে পারবেন।
সাধারণত লোকাল বাসগুলো শহরের রিজার্ভ বাজার পর্যন্ত যায়। এই এলাকাতেই
বিভিন্ন মানের হোটেল পাওয়া যায়,চাইলে ভালো মানের হোটেল অথবা কম খরচের
বাজেট হোটেলে থাকতে পারবেন।
আপনি যেহেতু খাগড়াছড়ি থেকে বিকেলের দিকে রওনা হবেন, তাই আগেই হোটেল
বুকিং করে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। এতে করে পৌঁছানোর পর কোনো ঝামেলা
ছাড়াই সরাসরি বিশ্রাম নিতে পারবেন।
বর্তমানে পর্যটন সুবিধা বাড়ার কারণে কাপ্তাই লেকে তৈরি হয়েছে বেশ কিছু
আধুনিক ও বিলাসবহুল হাউজবোট,যেখানে রাতযাপন করা যায়। ইচ্ছা করলে সেখানে থাকার অভিজ্ঞতাও নিতে
পারেন।
তবে বিকেলে খাগড়াছড়ি থেকে রওনা দিলে একই দিনে এসব হাউজবোটে ভ্রমণ করা
সাধারণত সম্ভব হয় না (যদি পুরো বোট রিজার্ভ না করা হয়)।
তাই সবচেয়ে ভালো পরিকল্পনা হলো, প্রথম রাতটি শহরের কোনো হোটেলে
কাটানো, এরপর পরদিন সকাল থেকে কাপ্তাই লেকে প্রমোদতরী বা ট্যুরিস্ট বোটে ঘুরে বেড়ানো। এতে পুরো ভ্রমণটাই হবে আরামদায়ক ও
উপভোগ্য।
এছাড়া লেকের মাঝে গড়ে ওঠা কিছু সুন্দর ইকো রিসোর্টও রয়েছে। প্রকৃতির
একদম কাছাকাছি থেকে শান্ত পরিবেশে সময় কাটাতে চাইলে এসব রিসোর্টেও
থাকতে পারেন।
রাঙামাটির রিজার্ভ বাজার ট্যুরিস্ট বোট ভাড়া
রিজার্ভ বাজার ট্যুরিস্ট বোট ভাড়ার বিস্তারিত:
বোটের ধরন ও ভাড়া: ছোট বোট ১,২০০-২,৫০০ টাকা (সিজনভেদে) এবং বড় বোটের ভাড়া সাধারণত ২,৫০০-৫০০০ টাকার আশেপাশে হয়। ঘাটেই অনেক বোট মালিকের সাথে সরাসরি দরদাম করে নৌকা নেওয়া যায়। তবে ছুটির দিনে বা সিজনে আগে থেকে বা পরে কথা বলে রাখা ভালো।
🚤 কোথা থেকে বোট ভাড়া করবেন?
রাঙামাটির রিজার্ভ বাজার এলাকায় কাপ্তাই লেক ভ্রমণের জন্য বেশ কয়েকটি নির্দিষ্ট ঘাট থেকে সহজেই বোট ভাড়া করা যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় তিনটি পয়েন্ট হলো—
রিজার্ভ বাজার লঞ্চ ঘাট: এটি মূল কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এখান থেকেই অধিকাংশ পর্যটক নৌকা ভাড়া করে থাকেন।
রিজার্ভ বাজার মসজিদ ঘাট: লঞ্চ ঘাটের একেবারে পাশেই অবস্থিত। এখান থেকেও সহজে বোট রিজার্ভ করা যায়।
রাঙ্গামাটিতে বোটে যেসব দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখানো হয়:
একটি বোট রিজার্ভ করলে সাধারণত কাপ্তাই লেকের আশপাশের প্রধান ৮–১০টি দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখানো হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো-
শুভলং ঝর্ণা (বড় ও ছোট)
ঝুলন্ত ব্রিজ
রাজবাড়ি ও রাজবন বিহার
পেদা টিং টিং / চাং পাং রেস্টুরেন্ট
পলওয়েল পার্ক ও অরণ্যক
সময়: সকাল ৯টার দিকে যাত্রা শুরু করে বিকেল ৫টার মধ্যে পুরো এলাকা ঘুরে আসা যায়।
পরামর্শ: অবশ্যই বোট ঠিক করার আগে চালকের সাথে কথা বলে পরিস্কার করে নিবেন যে কোন কোন স্পট তারা দেখাবে ।
দ্রষ্টব্য: পর্যটকদের ভিড় ও সিজন অনুযায়ী ভাড়ার পরিবর্তন হতে পারে।
এছাড়াও রাঙামাটির দেখার মত জায়গাগুলার মধ্যে রয়েছে- কাপ্তাই লেক, কাপ্তাই বাঁধ,চাকমা রাজার বাড়ি, নেভী একাডেমী, কর্নফুলি নদী, আরণ্যক, ডিভাইন লেক, ধুপপানি ঝর্ণা ইত্যাদি। রাঙামাটির সকল পর্যটন স্পট/ স্থান একদিনে ঘুরে বেড়ানো সম্ভব না। ঠিকমত ঘুরতে মিনিমাম ২-৩ দিন সময় লাগবে।
⚠️ কাপ্তাই লেক ভ্রমণে করণীয় ও সতর্কতা
কাপ্তাই লেক ভ্রমণকে সুন্দর ও নিরাপদ রাখতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অবশ্যই মনে রাখা উচিত-
কাপ্তাই লেক আমাদের দেশের একটি মূল্যবান সম্পদ। তাই লেকের পানি, আশপাশের প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হয়,এমন কোনো কাজ থেকে বিরত থাকুন।
স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতি সম্মান দেখান। তাদের ছবি তুলতে চাইলে আগে অনুমতি নেওয়া জরুরি।
সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রিত এলাকা, ক্যান্টনমেন্ট বা সেনা ক্যাম্পে ছবি তোলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ,এ বিষয়টি অবশ্যই মেনে চলুন।
ভ্রমণের আগে হোটেল/রিসোর্ট এবং বোট বুকিং করে রাখলে যাত্রা আরও ঝামেলামুক্ত হবে।
নিজের জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) বা এর একটি কপি সঙ্গে রাখা ভালো, প্রয়োজনে কাজে লাগতে পারে।
লেকের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা আমাদের দায়িত্ব। তাই যেখানে-সেখানে ময়লা না ফেলে নৌকায় থাকা ডাস্টবিন ব্যবহার করুন।
আপনার আরও কিছু জানার খাকলে কমেন্ট করুন 🙏
comment url